সদ্যজাত সন্তান দেখতে ভিন্ন রকম, এ কারণে আমাদের এলাকার এক ব্যক্তি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। সন্তান দেখতে ভিন্ন রকম হলে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ পোষণ করা এবং তালাক দেওয়া সংগত কিনা? এ ব্যাপারে শরীয়ত কী বলে?
উত্তর
সন্তানের গায়ের রং, চেহারা বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য সবসময় পিতা-মাতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক সময় সন্তান পূর্বপুরুষদের (দাদা-দাদি, নানা-নানি বা আরও আগের বংশধারার) কোনো বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে। তাই কেবল সন্তানের রং বা আকৃতি ভিন্ন হওয়ার কারণে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ পোষণ করা বা অপবাদ দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়।
এ বিষয়ে সহীহ হাদিসে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, বনি ফাযারা গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বলল, “আমার স্ত্রী একটি কালো বর্ণের সন্তান জন্ম দিয়েছে।” সে মূলত সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কি উট আছে?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “সেগুলোর রং কী?” সে বলল, “লাল।” তিনি বললেন, “তাদের মধ্যে কি ধূসর বা মেটে রঙের উট আছে?” সে বলল, “হ্যাঁ, আছে।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “সেগুলো কীভাবে এলো?” লোকটি বলল, “সম্ভবত পূর্বপুরুষদের বংশগত প্রভাবের কারণে।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
وَهَذَا عَسَى أَنْ يَكُونَ نَزَعَهُ عِرْقٌ
অর্থাৎ, “তোমার এই সন্তানও হয়তো বংশগত প্রভাবের কারণে এমন হয়েছে।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫০০)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেন, শুধুমাত্র গায়ের রং বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের অমিলের কারণে সন্তানের বংশপরিচয় অস্বীকার করা বৈধ নয়। যদি পিতা-মাতার গায়ের রং একরকম হয় আর সন্তানের রং ভিন্ন হয়, তবুও সন্তানকে বৈধ সন্তান হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কারণ বংশগত বৈশিষ্ট্য পূর্বপুরুষদের দিক থেকেও স্থানান্তরিত হতে পারে।
(শারহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম, ১০/১৩৪)
অতএব, কেবল সন্তানের চেহারা, আকৃতি বা গায়ের রং ভিন্ন হওয়ার কারণে স্ত্রীর প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা, তাকে ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা বা পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করা গুরুতর অন্যায়। ইসলামে কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করার জন্য সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। সন্দেহ, ধারণা বা বাহ্যিক অমিল কোনোভাবেই প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না।
একইভাবে, শুধুমাত্র এ ধরনের সন্দেহের ভিত্তিতে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়। একজন মুসলিমের উচিত পারিবারিক বিষয়ে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বিচারের পরিচয় দেওয়া এবং ভিত্তিহীন সন্দেহ থেকে বিরত থাকা।
সারকথা:
সন্তান দেখতে পিতা-মাতার চেয়ে ভিন্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়; বরং এটি স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত বিষয়। তাই শুধুমাত্র এ কারণে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ, অপবাদ বা তালাক দেওয়া ইসলামের শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
والله أعلم بالصواب
(আল্লাহই সর্বাধিক ভালো জানেন)
তথ্যসূত্র ও দলিল
আরো মাসআলা পড়ুন
ঘুমানোর পর রাতে যদি হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় তাহলে কি পুনরায় ঘুমানোর দু‘আ পড়ে ঘুমাতে হবে?
পারিবারিক মাসআলাসূরা ফাতিহা কখন নাযিল হয়েছে? আল্লাহ্ তাআলা বিশ্ববাসীর উপর নামায ফরয করার পর নাযিল হয়েছে; নাকি আগে নাযিল হয়েছে? আমি সময়টি নির্দিষ্ট করা চাই।
আকীদা ও ঈমানহাত বুকের উপরে বাধা উচিত নাকি নাভির উপরে বাধা উচিত? এবং এক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন মাযহাব বিভিন্ন কথাবার্তা বলে তাহলে কোনটি সঠিক?
নামাজকাফেরদের কোন পোশাকগুলো আমাদেরকে পরতে নিষেধ করা হয়েছে?
হালাল-হারামনারী-পুরুষের মাথার চুল ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে কি? সেলুনের চুল কাটার পর যে চুল আবর্জনা হিসাবে থেকে যায়, তা বিক্রি করা যাবে কি?
অন্যান্যআপনার কোনো জিজ্ঞাসা আছে?
নির্ভরযোগ্য আলেমদের মাধ্যমে উত্তর পেতে প্রশ্ন করুন।